bartajogot24@gmail.com রবিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ই ফাল্গুন ১৪৩০

আফ্রিকার দেশগুলোর জ্যামিতিক সীমানা রেখার নেপথ্য কথা

শাব্বির আহম্মদ

প্রকাশিত:
২৩ নভেম্বার ২০২৩, ১৫:৫২

ফটো কোলাজ: বার্তাজগৎ

বিশ্বমানচিত্রে দেখা যায় আফ্রিকা বিশেষত উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর সীমানা মানচিত্র জ্যামিতিক রেখাচিত্রের মত। এ দেশগুলোর সীমানা রেখাগুলো অপেক্ষাকৃত সোজা।পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সীমানা বা বর্ডার লাইনের ক্ষেত্রে সাধারণত এরকম দেখা যায় না।আফ্রিকার দেশগুলোর এই সোজাভাবে রেখা টানা সীমানার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নও করা হয় প্রায়ই।

এর পিছনের কারণ হলো ইউরোপের উপনিবেশিক শাসকগণের আফ্রিকা ভাগাভাগি করে নেয়া। পর্তুগাল,ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানিঃ আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময়ে ঔপনিবেশ গড়ে তোলে। কিন্তু প্রথম দিকে এগুলো ছিল উপকূলীয় এলাকা সংলগ্ন জনপদে স্থাপিত ছোট ছোট বাণিজ্য কেন্দ্র। ১৮৭০ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার মাত্র ১০ ভাগ সীমানা ইউরোপীয়দের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা উপকূল ছেড়ে খুব একটা ভিতরে মূল ভূখণ্ডের দিকে ঢুকতো না। কারণ ম্যালেরিয়া সহ অন্যান্য টপিক্যাল ডিজিজের ভয় ছিল। পরে যখন চিকিৎসা ব্যবস্থা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলো বিশেষ করে কুইনাইন আবিষ্কার হলো আর দীর্ঘ মন্দার পর ইউরোপীয়দের বাজার আরো সম্প্রসারণ করার দরকার হলো তখন তারা মূল ভূখণ্ডের দিকে কাঁচামাল সংগ্রহ ও সম্পদ আহরণের জন্য আরো নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকলো ।ফলে মাত্র ৪০-৪৫ বছরে (১৮৭০-১৯১৫)আফ্রিকা মহাদেশের ৯০ ভাগ এলাকা ইউরোপীয় উপনিবেশের অধীনে চলে আসে। ইউরোপের শক্তিরা আফ্রিকার বাজার ও সম্পদ আহরণের জন্য একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে থাকল এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সংঘাত যুদ্ধে রূপ না নেয় এজন্য জার্মানির প্রথম চ্যান্সেলর অটোভন বিসমার্ক এর প্রচেষ্টায় জার্মানির বার্লিনে ১৮৮৪ সালে ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে এক সম্মেলন হয়।সেখানে তারা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা ও আফ্রিকার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রাথমিকভাবে একমতে পৌছায়। পরস্পরকে আক্রমণ না করা, সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না নিয়ে কোন এলাকাকে নিজের দাবী না করা, কোন পক্ষকে না জানিয়ে অপর পক্ষের এলাকায় প্রবেশ করা ইত্যাদি ছিল সম্মেলনে গৃহীত সমঝোতা। এ সমঝোতার উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে দেশগুলো ১৯২০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মধ্যে আফ্রিকার দেশগুলোর সীমানা ভাগ করে নেয়।

বস্তুত এই ভাগাভাগি প্রক্রিয়ায় আফ্রিকানদের কোন অংশগ্রহণও ছিলনা এমনকি মতামত দেওয়ারও সুযোগ ছিল না।এ ছিল কেবলই উপনিবেশিক প্রভুদের স্বার্থ ও সুবিধা ইচ্ছেমত ভাগাভাগির বিষয়। এ কাজে জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি,ধর্ম, ঐতিহ্যবাহী জীবন ব্যবস্থা কোন কিছুই বিবেচ্য ছিল না এমনকি ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় নেয়া হয় নাই।ঘরে বসে দাগ টেনে এটুকু তোমার এটুকু আমার এ রকম বিবেচনায় ভাগাভাগি করা হয়েছিল। ১৯০৬ সালে ফ্রান্স আর ব্রিটেনের মধ্যে এ প্রসঙ্গে নাইজেরিয়া আর নাইজারের সীমানা নির্ধারণের চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড সেলিস বারির উক্তিটি খুবই প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন "আমরা ম্যাপের উপর এমন স্থানে দাগ টানছি যেখানে কখনো কোনও সাদা মানুষের পা পড়েনি। আমরা একে অপরকে দিয়ে দিচ্ছি পাহাড়-পর্বত নদী আর লেক গুলো কিন্তু আমাদের এ কাজে ছোট একটু প্রতিবন্ধকতা এই যে আমরা আসলে জানি না যে, প্রকৃতপক্ষে কোথায় এই পাহাড়-নদী-হ্রদগুলো!”

এ উক্তি থেকেই বুঝতে বাকি থাকেনা যে এ সীমানা ভাগাভাগি ঘরে বসে ম্যাপের উপর দাগ টেনে করা হয়েছিল- মাঠ পর্যায়ে বাস্তব ভিত্তিক সরেজমিনে নয়। আর এতে আফ্রিকার মানুষদের কোন অংশগ্রহণ ছিল না। বলা হয় এক সোমালি জনগোষ্ঠীই ভাগ হয়ে গিয়েছে পাঁচটি দেশের মধ্যে তারা এখন ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, জিবুতি,কেনিয়া ইত্যাদি দেশের নাগরিক।অন্যান্য জাতির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। একটি জাতির মানুষ হয়ে গেছে কয়েকটি দেশের নাগরিক।আর সেই সময় থেকে আজকে পর্যন্ত, আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে জাতিগত ও সীমানাগত দ্বন্দ্ব সংঘাতের একটি প্রধান কারণ হয়ে আছে এই অবৈজ্ঞানিক সীমানা বিভাজন।১৭৩ টি উপজাতির জনগোষ্ঠী বিভাজিত হয়ে গেছে দেশে দেশে কিন্তু যারা এই বিভাজনকে সমর্থন করেন তারা বলেন-এভাবে ভাগ না করে প্রত্যেক উপজাতিদেরকে একটি করে রাষ্ট্র দিলে আফ্রিকাকে নাকি ২০০০ ভাগে ভাগ করতে হতো।


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর